Wednesday, November 20, 2013

জাবর কাটা

দুই তৃতীয়াংশ পার করে ফেললাম প্রায়...মেরে কেটে আর তিন ভাগের এক ভাগ বাকি.....এতগুলো দিন বন্দী হয়েই কাটিয়ে দিলাম। ভয় আমাকে বন্দী করে রেখে দিল...হারিয়ে ফেলার ভয় ...মনে হয়েছে, এটা হলে মানতে পারব না, ওইটা হলে বাঁচব না, সেটা না পেলে মাথা হেঁট হয়ে যাবে...

শুধুমাত্র এই জুজুই আমাকে আমার মত করে কোনোদিন বাঁচতেই দিল না...আজ যখন দেওয়ালে পিঠ.... যখন, যে যে পরিস্থিতি কে ভয় পেয়েছি...তাদের কয়েকটির সাথে দিব্যি মোলাকাত হয়েছে...হাত মিলিয়েছি...দু চারটে খোশগল্পও যে হয়নি সেটা হলফ করে বলা যাচ্ছেনা...তখন মগডালের ওপর থেকে পর্যবেক্ষণ করে (উড়তে উড়তে করতে পারলে আর ভালো হত, তবে ক্ষমতায় কুলিয়ে উঠল না) যেটা সবচেয়ে বেশি পাচ্ছে, সেটা হল হাসি। ভুল করবেন না...অন্য কারোকে দেখে না... শুধু নিজেকে দেখে...

ছোট বেলায়, আমরা ভাই বোন রা মারপিট করতাম...যখন ভাই দের সাথে পারতাম না, তখন, ওদের কাতুকুতু দিতাম...একটা মজার ব্যাপার হল যে আমার কোনোদিন কাতুকুতু লাগেনা...ফলেই ওরা কাবু...আমাকে এগোতে দেখলেই পালিয়ে যেত...ছেলেবেলার এই ছোট অভিজ্ঞতার উপলব্ধি কে যদি বড় বেলার উপলব্ধির সাথে মেলাতে পারতাম, অনেক আগেই?...।


Thursday, November 14, 2013

বিবেকানন্দের মুলুক থেকে অরবিন্দের খাসতালুকে


২৬ ডিসেম্বর ২০০৫... একটা পাথরের স্তম্ভের ওপর রাশি রাশি মালা চাপানো হচ্ছে । ইতস্তত দাঁড়িয়ে, কিছু মানুষ । কৌতূহল হল, তাই আমিও একটু এগিয়ে গিয়ে উঁকি মারলাম । স্তম্ভের ওপর, ইস্পাত ফলকের লেখার অনেকটাই ঢাকা পরে গেছে । স্তম্ভ থেকে কিছু হাত দূরে, সবুজের ঢাল পেরিয়ে, যে মহাসমুদ্র শান্ত মেয়ের মত, চুমকি-বসানো  চিকিমিকি আঁচল বিছিয়ে, রোদ পোয়াচ্ছে ... প্রকৃতির খেয়ালে, একটি বছর আগে, ঠিক এই দিনেই, এই নিরীহ মেয়েটিই ভয়ঙ্করি রূপে, ভীষণ আকার ধারন করে, তার কালো চুলের গোছা দিয়ে আকাশ ঢেকে, প্রবল গর্জনে ধেয়ে এসে, অসহায় মানুষের আকুতি কে দু-পায়ে মাড়িয়ে, এই তটভূমি, লোকবসতি ব্যবসা-বাণিজ্য, সমস্ত স্থিতিশীলতা কে  লণ্ডভণ্ড করে, তাণ্ডব শেষে, ফিরে গেছে নিজের ঘরের কোনে। আজ সে বাধ্য, শান্ত, কেমন যেন আনমনা। ইস্পাত-ফলকে, সেই তাণ্ডবের বিবরণ।    
কুমারি মাতার মন্দিরের সামনে এসে দাঁড়ালাম । আমি যে ভারতীয় উপদ্বিপের শেষ বিন্দু তে, এতক্ষনে, নিশ্চয় বুঝে গেছেন আপনারা। থিরুবনন্তপুরম থেকে গাড়ি তে ঘণ্টা তিনেকের পথ, কন্যাকুমারী। সারাটা রাস্তা সবুজ সঞ্চয় করতে করতে এলাম। চোখ ভরে ,মন জুড়িয়ে, আদেখলার মত, কোঁচড় ভরে...সবুজ কুড়িয়ে নিলাম, যদি সেটা দিয়ে আগামী পথের রুক্ষতা কে কিছু মাত্র ঢাকতে পারি...এই আশায় ।  
কুমারি আম্মান, এই ছোট্ট মন্দির-শহরের অধিষ্ঠাত্রী দেবী । পাণ্ড্য রাজবংশের তৈরি এই মন্দির, হাজার তিনেক বছর ধরে যেন, আরব সাগর, ভারত মহাসাগর আর বঙ্গোপসাগরের মিলন কে আগলে রেখেছে পরে পরে, চোল আর নায়ক রাজাদের হাতে, এই মন্দির সংস্কার হয় ।
আকাশ লাল করে, তিন সাগর কে তিন বর্ণে রাঙ্গিয়ে, সূর্য্যি পাটে গেলেন। আবছায়া তে মন্দিরের প্রাচীরের গায়ে জড়াজড়ি করা দোকান গুলোর রকমারি পসরার ডাক কে উপেক্ষা করে ফটক পেরিয়ে ঢুকে পরলাম মন্দির-প্রাঙ্গনে । গর্ভগৃহে প্রবেশের মুখে ছোটখাটো একটা জটলা । লক্ষ্য করলাম, সমস্ত পুরুষ দর্শনার্থীর পরনে সাদা ধুতি, নিরাবরন ঊর্ধ্বাঙ্গ তাদের । দেশ-বয়স-অর্থসামর্থ্য নির্বিশেষে তারা আজ করজোড়ে, একসাথে, মা এর দর্শন অভিপ্রায়ে দাঁড়িয়ে...ধর্ম যে শুধুমাত্র বিভেদ-সৃষ্টিকারী নয়, মানুষে মানুষে সমতা আনতেও সে পারে...এই উপলব্ধি হল আমার ।  
কুলুঙ্গির প্রদীপের আলয়, নীল বর্ণা দেবী, হাতে জপমালা, অঙ্গে স্বর্ণাভরন , মাথায় হীরা- চুনি খচিত স্বর্ণ-মুকুট। শোনা যায়, যে,দেবীর নথের হিরের দ্যুতি নাকি বহু জাহাজ কে দিকভ্রান্ত করেছে। নথের হীরের চিকিমিকি কে আলোকস্তম্ভের আলো ভেবে, ভুল করে, এই মন্দির সংলগ্ন উপকুলেই ভিড়েছে বহু জাহাজ, আর তার ফলস্বরুপ নাকি, পূব–মুখি দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয় পরবর্তীকালে। মন্দিরের পাথরের দেওয়ালে, কুলুঙ্গির প্রদীপের স্বল্প আলোর প্রতিফলনে, আলো-ছায়ার নৃত্যে, চাঁপা ফুলের আর ধুপের সেই মন আবেশ করা গন্ধের এক অতিপ্রাকৃত পরিবেশে, এই গল্পও বিশ্বাসযোগ্য লাগে ।
দিনের আলোতে, দেখলাম, মন্দিরের দক্ষিণপূর্ব দিক বরাবর মূল ভূখণ্ড থেকে আধ কিলোমিটার মত দূরত্বে, পাশাপাশি দুটি প্রস্তরখণ্ডের ওপর, দুটি স্থাপত্য । একটি তে  বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল, আর অপরটিতে , তামিল কবি থিরুভাল্লুভার এর প্রস্তর মূর্তি  লঞ্চ পরিসেবার কার্যালয়ের সামনে তেল চুপচুপে মাথার সারি, নারকেল তেল আর জুঁই ফুলের সুবাসে, আর নানা ধরনের ‘মাদ্রাসি’ ভাষার সমন্বয়ে ঘ্রানেন্দ্রিয় আর শ্রবণেন্দ্রিয়, এই দু এর ওপরেই কিঞ্চিত চাপ অনুভব করলাম। জেটি থেকে একটা লঞ্চ এ চেপে চললাম মোচার খোলায় দুলতে দুলতে, সকালে খাওয়া ইডলি টা জলেই বিসর্জন দিয়ে ।
মানুষ তার ক্ষুদ্র শক্তির কত বড়াই করে, বিজ্ঞান-তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কত যে তার আস্ফালন, উন্নত মগজাস্ত্র দিয়ে আশেপাশের সব কিছু কে করায়ত্ত করার মত্ত প্রচেষ্টা তার । আর প্রকৃতি শুধু প্রশ্রয়ের মুচকি হাসি হাসে। এই মহাসাগরের মাঝখানে, নিজের ক্ষুদ্রতাকে খুব বেশি করে অনুভব করলাম যেন ।
ধুক্ তে ধুক তে পৌঁছলাম বিবেকানন্দর স্মৃতি ধন্য বিবেকানন্দ রক মেমোরিয়াল এ আদিগন্ত চোখ যায় যতদূর, নীল, সবুজ,খয়েরি, হলুদ এসে একে অপরের সাথে মিশে গেছে ।  বিভেদের মাঝে মিলন...ভারতবর্ষের প্রাণসত্তার যে মূল সুর , সেই আদর্শের প্রতিফলন যেন ভারতের মাটি ছাড়িয়ে, সাগরের জলেও দেখা যায় । রেলিং–ঘেরা চত্বরে, হাজার খানেক মানুষ , তবু সব কোলাহল, ব্যাস্ততা কিসের নির্দেশে যেন একটা ‘টাইম ওয়ারপ এ। সবাই একদৃষ্টে ভয়ঙ্করের রূপ দেখছে আবিষ্ট হয়ে
বিবেকানন্দ স্মৃতি সৌধ এ দুটি মণ্ডপ । একটি তে পাথরের মধ্যে দেবী কুমারীর পায়ের ছাপ, অপরটি স্বামীজির মণ্ডপ। এখানে স্বামীজির সৌম্য মূর্তি, আর আছে একটি ধ্যানমন্দির, শতরঞ্চি পাতা বাহুল্য বর্জিত এই ধ্যানমন্দিরে কেউ ধ্যানাসনে চোখ বুজে বসে, আবার কেউ কেউ দেওয়ালে পিঠ লাগিয়ে হাঁটু দুটো দু হাতের বেষ্টনী তে ধরে বসে আছে, শরীর শিথিল , মন শান্ত, অন্তরমুখি যাত্রা শুরু করেছে তারা ।
কিছু দূরে থিরুভাল্লুভার এর স্মৃতিসৌধ তার উচ্চতা আর আকার দিয়ে এই বিবেকানন্দ স্মৃতিসৌধকে আড়াল করে রেখেছে। ইনি, তামিল কবি, দার্শনিকদের অন্যতম এবং এনার রচিত থিরুক্কুরাল তামিলদের কাছে ধর্মগ্রন্থের সমতুল্য ।
ফিরতি পথে লঞ্চে কিছু বাংলা কথার মধ্যে মাছ ভাত এর জন্যে হা হুতাশ কানে এলো । নিজেকে মাছরসিক বলে মনে হয়নি কখনই আমার , কিন্তু মাছ যে বাঙালির ‘জিন’ এ, নিস্তার নেই যে । ধোসার দেশে বেশ কিছু দিন হল, আলু পটল কাঁচা লঙ্কা  দিয়ে কাটাপোনার ঝোলের জন্য কেমন যেন হু হু করতে লাগলো মনটা
বিবেকানন্দপুরমের সমুদ্র তট থেকে দেখা সূর্যাস্ত আমার দেখা সূর্যাস্ত গুলোর মধ্যে অন্যতম। এটি বিবেকানন্দ কেন্দ্রের মুখ্য কার্যালয় । পর্যটকদের এখানে থাকা খাওয়ার সুন্দর বন্দোবস্ত আছে বিবেকানন্দপুরম থেকে আমাদের অস্থায়ী বাসস্থান, সমুদ্রপারের তামিলনাড়ু ট্যুরিজম এর দিকে চললাম । বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই হোটেল, বারান্দায় বসলে, সামনেই সমুদ্র,  অদূরে তিন রঙের জলরাশি, বিবেকানন্দ রক মেমরিয়াল আর থিরুভাল্লুভার এর স্মৃতিসৌধ, সামনে, ঘাসে মোরা লন, সেখানে ইতস্তত ময়ুর ঘুরে বেড়াচ্ছে , এখানে বসেই একটা গোটা দিন কাটিয়ে দেওয়া যায়।
ভোরের আলো ফুটতে তখনো ঘণ্টা দুয়েক বাকি ।  মিশকালো পটভূমির ওপর সাদা, দক্ষিণের গোপুরাম স্থাপত্যশৈলীতে ছোট একখানি মন্দির,  সামনে চালের গুঁড়ো দিয়ে আলপনা আঁকা , টুনি বাল্ব দিয়ে সাজানো, সদ্য জল দিয়ে ধোয়া হয়েছে।  স্বর্ণচাঁপা আর ধুপের গন্ধ ভেসে আসছে ভেতর থেকে। মন্দিরের সামনে একটা লাউড স্পিকার থেকে গম্ভীর সুরেলা গলা তে তামিল ভাষায় স্তোত্রপাঠ শোনা যাচ্ছে, বিগ্রহ দর্শন হল না, তবুও মাহেন্দ্রক্ষণের আশেপাশে, পরিবেশটা ভারী পবিত্র লাগলো, ক্লান্তি দূর হল
চোখ ডলছি তখনো... হুড়মুড় করে নেমেছি বোঁচকাবুচকি , বাচ্চা বুড়ো সমেত...কেউ সুটকেস টপকে, কেউ অন্যের পায়ের ফাঁক গলে। ভিল্লুপুরম জংশন এ ভোর সাড়ে তিনটের দিকে ট্রেন থামে ঠিক ২ মিনিট। আগের দিন সন্ধ্যায় কন্যাকুমারি থেকে ট্রেন এ চেপেছি , না হয়েছে ভাল করে রাতের খাওয়া আর আশঙ্কা তে না হয়েছে ঘুম । ভিল্লুপুরম থেকে আন্দাজ ৪০ কিমি. দূরে ঋষি অরবিন্দের স্মৃতিধন্য পুদুচ্চেরি বা পন্ডিচেরি, আমাদের পরের গন্তব্যস্থল ।
প্রাচ্যের ‘ফরাসি রিভিয়েরা’, এই পন্ডিচেরি , ভারতে ফরাসিদের বৃহত্তম উপনিবেশ ছিল । চেন্নাই থেকে মাত্র ১৬০ কিমি. অথচ পন্ডি আর চেন্নাই এর থেকে সাংস্কৃতিক দুরত্ব প্যারিস থেকে দিল্লির দুরত্বের সমান । ভূমধ্যসাগরীয় স্থাপত্যের ধাঁচে বাড়ি, দুধ সাদা বাড়ির গায়ে গোলাপি বোগনভিলিয়ার ঝাড়, ফুটপাথে, রট আয়রনের চেয়ার টেবিল পেতে, শীতের মিঠে রোদ পোয়াতে পোয়াতে কফি সহযোগে ‘রোলস’ আর ‘ক্রওসো’ খেতে খেতে দিব্যি আড্ডা চলছে । চেনা লাগল । আমাদের উত্তর কলকাতার রকের আড্ডায়  মাটির ভাঁড়ে চা সহযোগে আলুর চপ এর সাথে কোথায় যেন একটা মিল জীবনে চলার ছন্দে মিল। এখানেও জীবন চলে দুলকি চালে । তাড়াহুড়ো নেই, নেই ধাক্কাধাক্কি 
পুরনো আর নতুন শহরের মাঝে একটা খালের ব্যবধান । নতুন পন্ডিচেরির সমুদ্রের ধার বাঁধানো রেলিং দিয়ে , পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, সামনে একটি স্তম্ভের ওপর গান্ধী মূর্তি । আশেপাশে ছোট ছোট খাবারের ঠেলা গাড়ি , আর খানিক এগিয়ে অনেক ক্যাফেটেরিয়া। সামনে ঝকঝকে রাজপথ , ফরাসি দের মত লাল চোঙা টুপি পরে, কনস্টেবল রা ট্র্যাফিক সামলাচ্ছে , অপর পারেই সারি দিয়ে ঝাঁ চকচকে আন্তর্জাতিক মানের পাঁচ-সাত তারা হোটেল এর আলোর ঝলমলানি তে  চোখ টনটন করে। সার বাধা পাম গাছে নীল সবুজ টুনি বাল্ব পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে লাগানো, দূর থেকে দেখে মনে হয়, মধ্য প্রাচ্যের কোনও সমুদ্রতটে এসে পরেছি যেন
অরবিন্দ ঘোষ, পরবর্তী কালে ঋষি অরবিন্দ হিসেবে যার বেশি পরিচিতি, পন্ডিচেরি তে অরবিন্দ আশ্রম স্থাপনা করেন ১৯২৬ সালের নভেম্বর মাসে। এই বিশাল কর্মকাণ্ডে ওনার সহযোগী ছিলেন মীরা আলফাসসা, ‘মাদার’ নামেই যিনি পরিচিত ।  আজ সারা পৃথিবী জুড়ে অরবিন্দ আশ্রম এর শাখা, মানুষের আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশ ঘটানোই, এদের মূল লক্ষ্য ।
আগেই বলেছি, খালের দুই পারে দুই শহর । সাদা শহর , বা   ‘ভিলে ব্লাঞ্চ’ এ ফরাসি রা থাকতেন আর কালো শহর বা ‘ভিলে নয়ের’ এ থাকতেন স্থানীয় অধিবাসীরা । সাদা শহরে , পথ হারিয়ে অরবিন্দ আশ্রম এর কাছে , সাইকেল আরোহী এক সাদা সাহেব কে চোস্ত কনভেন্ট মার্কা ইংরেজি তে পথের হদিস চাইতেই, সে গড়গড় করে আরো চোস্ত কলকত্তাইয়া বাংলা তে আমাকে রাস্তা বুঝিয়ে দিলো। দুটো জিনিষ হল এতে, প্রথমত পণ্ডিচেরি তে ইংরেজি বলার চেষ্টা করিনি আর...দ্বিতীয়ত, এটা বুঝলাম যে, ভারতের এই দক্ষিণ প্রান্তে, অরবিন্দের আনুকুল্যে ফরাসি বিপ্লব কে ছাপিয়ে, বঙ্গ বিপ্লব হয়েছে নিঃশব্দে বহু বিদেশি এই আশ্রমে শিষ্যত্ব নিয়ে, তাদের গুরুর মন্ত্রের সাথে গুরুর ভাষা কেও গ্রহন করেছেন দেখলাম।
কালো শহরে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। এক ঘোর কৃষ্ণবর্ণা ফুলওয়ালীর কাছে ফুল কিনতে গিয়েছিলাম, মাথায় লাগাবো বলে, ফুলের ঝুড়ি সরিয়ে, সে এসে আমার মাথায় , শুধু যে সাদা-কমলা রঙের মালা টা লাগিয়ে দিলো, তাইই না, একটাও পয়সা নিতে অস্বীকার করল । হাবেভাবে বুঝিয়ে দিলো, যে আমি বাইরে থেকে এসেছি, অতিথি, তাই এটা সে দিলো আমাকে। ঘটনা টা বহু বছর আগের, এখনো সেই উপহার আর হাসির কথা মনের এক কোনে সযত্নে রেখে দিয়েছি ।
পন্ডিচেরি থেকে অরোভিল বা আলোর শহর , কিলোমিটার দশেক । পন্ডিচেরি তে সারাদিনের মত সাইকেল আর বাইক ভাড়া পাওয়া যায় স্বাধীন ভাবে, নিজের স্বাচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে বাইক ভাড়া করে অরোভিল অভিমুখে চললাম । প্রায় ৪৩ দেশের হাজার দুয়েক মানুষ ‘মাদারের’ র মানসী, এই অরোভিলে বসবাস করে অরোভিলের আধ্যাত্মিক কেন্দ্রে মাতৃ মন্দির ... সোনার চাকতি দিয়ে মোড়া , ভিতরে ধপধপে সাদা, নিরাভরণ ,শুধু বড়সড় একটা স্ফটিক ছাড়া কিছুই নেই । মানুষের অন্তর আর বাইরের প্রতীকি বোধহয় । বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে এই শহরে কত যে নাম না জানা গাছ , কত অজানা ফুলের ঝিম-ধরানো গন্ধ , কত রকমের, কত বর্ণের মানুষ , কত জীবন যাপনের ধারা     , কত দেশ বিদেশের খাবার , দেখে আর চেখে যেন আশ আর  মেটেনা। ‘কর্নার কাফে’ তে খাওয়া , ‘হাঙ্গারিয়ান গোলাশ’  আর কড়কড়ে সেঁকা পাউরুটি র স্বাদ পেতে আবার যেতেই হবে অরোভিলে।
এবার ঘরে ফেরার পালা। ফিরতে যে হবেই। কোলাহল, যানজট , হর্নের আওয়াজ, ছোটাছুটি, বাংলা সিরিয়াল, বাজার, স্কুল, দশটা-পাঁচটা যে ডাকছে আবার। তাই, নতুন অবসরপ্রাপ্তি অবধি...অবসর বিদায় ।                               

এবার মালাবার

কথায় বলে “ক্যারিয়িং কোল টু নিউক্যাসল্‌” আমাদের দিশী ভাষায় “বরেলি মে বাঁশ লে যানা”। মানে আসলে একই। নিউক্যাসলে কয়লার খনি আছে। সেখানে কয়লা নিয়ে যাওয়া বোকামো। বেরিলিতে (বরেলি বলে হিন্দি তে) খুব ভালো বাঁশ পাওয়া যায় কিনা তা জানিনা। তবে প্রবচনটার মানে একই। কোয়েম্বাত্তুর পৌঁছে হাতের মালপত্রের ভারের চোটে মনে হলো এই প্রবচনের বাংলা হওয়া উচিত “কোয়েম্বাত্তুরে কাপড় নিয়ে যাওয়া”। শুনলাম গোটা ভারতের পোষাক উৎপাদনের সিংহভাগ এই শহর থেকেই হয়। চতুর্দিকে কাপড়ের কল। উটি থেকে রওনা হয়ে সন্ধ্যের ঝোঁকে এসে পৌঁছেছি ভারতের এই নতুন ম্যাঞ্চেস্টারে। ব্রিটিশরা আমাদের ছেড়ে গেলেও আমরা এখনো কোন কিছুর তুলনা আনতে গেলে বিলেতি উদাহরনই খুঁজি। নয়ত, একসময় দুনিয়া জোড়া খ্যাতি সম্পন্ন মসলিন কাপড় তৈরি হত  আমাদেরই বাংলায়। সে উদাহরন মনে আসেনা কেন?
কোয়েম্বাত্তুরে কাপড় কিনতে আসিনি অবশ্য। এর আগে “দক্ষিনাবর্ত” তেই লিখেছি, চেন্নাইতে আমরা শাড়ি কেনার কোটা পূর্ন করেই এসেছি। কোয়েম্বাত্তুরে ‘ক’ এর বড় মহিমা। কাপড়ের ক থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকলেও কলার ‘ক’ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারলাম না। ড্রাইভার বাবাজি রাস্তার পাশে ক্যাঁচ করে গাড়ি দাঁড় করাতেই...সবুজ, হলুদ, লাল, রঙের নানা আকারের কোয়েম্বাত্তুরের কলার কাঁদি, গাড়ির খোলা জানলা দিয়ে বর্শার ফলার মত ঢুকে এসে আমাদের কোণঠাসা করে দিলো একেবারে। হলুদ রঙের চাঁপা কলা মার্কা একটা কাঁদি কিনে তবে পরিত্রান পাই। এখানের কাঁচকলা ভাজার স্বাদ নিতে কিন্তু কেউ ভুলবেন না যেন ।
কোয়েম্বাত্তুরে  পেরিয়ে তামিলনাড়ু আর কেরল এর সীমান্ত টপকে, ওপারের পালঘাটের (মালায়লি তে পালাক্কাড়) দিকে রওনা দিতে হবে, কারন পালাক্কাড় জংশন স্টেশন থেকেই রাতের ট্রেন এ আমাদের মালাবারের ট্যুর শুরু। কোয়েম্বাত্তুর তামিলনাড়ুতে, সেখান থেকে পালাক্কাড় বড়জোর ঘণ্টা খানেকের রাস্তা। এর পরে পশ্চিমঘাট পর্বত এ পালঘাট গিরিপথ, বলা হয় ‘পালঘাট গ্যাপ’ যার ওপারে  উপকূলবর্তি কেরালা, এই গিরিপথ প্রকৃতির খেয়ালে তৈরি আর তামিলনাড়ু হয়ে স্থলপথে কেরলে প্রবেশের সবচেয়ে সোজা রাস্তা।
পালঘাট শহর এবং এই সমগ্র জেলা, কেরলের ভাতের জোগানদার। ‘রাইস বউল অফ কেরালা’ চোখ জুড়িয়ে দেয়। দূরে নীলচে পাহাড়ের সারি আর সবুজ ধানের ক্ষেত যেন ঢেউ এর মত সেই পাহাড়ের দিকে চলেছে । খুব আপন, খুব মন কেমন করা কিছু। আমরা চেনা ঘেরাটোপ এর একঘেয়েমি কাটাতে দূরে পাড়ি দিতে চাই, অথচ অনেক দূরে গিয়েও বোধহয় আমাদের মন, চেনা জায়গার বর্ণ, গন্ধ, স্পর্শ খুঁজে বেরায়
শ্রীঅনন্তপুর । দক্ষিনে শ্রী হয়েছে থিরু, আর অনন্তপুর হয়েছে অনন্তপুরম । নামটা বড় বটে, কিন্তু ভারি সুন্দর । ঠিক যেন প্রাচীন ভারতের কোন জনপদের নাম ।  প্রাচীন সমৃদ্ধশালী ত্রিবাঙ্কুর রাজ্যের রাজধানী এই থিরুবনন্তপুরম । সমগ্র ভারতের মধ্যে অন্যতম বিষ্ণু মন্দির, শ্রী পদ্মনাভস্বামী মন্দির এর আশেপাশে এই শহর গড়ে ওঠে ত্রিবাঙ্কুর মহারাজ দের পৃষ্ঠপোষকতায় । আজ ও এই অতি আধুনিকতার যুগেও এই রাজধানি শহরের প্রাণকেন্দ্র কিন্তু কোনও আকাশচুম্বী টাওয়ার অথবা কোনও শপিং মল নয় । এই মন্দির কে ঘিরেই এবং এই মন্দির থেকেই আজও এই শহরের ব্যাস্ততার, আধুনিকতার, সংস্কৃতির শুরু মন্দিরের ভিতর শ্রী বিষ্ণুর অনন্তশয়ানে শায়িত মূর্তি অথবা মন্দিরের গায়ে অপূর্ব  কাঠের কারুকার্য দেখতে, যেমন  অনেক দূর থেকে মানুষ ছুটে আসে, তেমনি অন্ধ ভক্তের দল ভিড় করে, যারা কিছু না দেখে, না বুঝে, না জেনে, শুধু বিশ্বাস করতে আসে, এতদিনের জীবনের ব্যাথার বোঝা নামাতে আসে, প্রতিকার চাইতে আসে । চাঁপা ফুল, ধুনোর আর অন্তরের গভীরতা থেকে উঠে আসা বিশ্বাসের গন্ধ যেন আমার এতদিনের লালিত, মনের যুক্তিবাদি অংশকে এলোমেলো করে দেয় । আমারও এদের মত করে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে । 
থিরুবনন্তপুরম বড় ‘বিচিত্র’ শহর । এর চারিদিকে ‘বিচ’ । শহরের মধ্যিখানে শঙ্খমুঘম বীচ, (এই শঙ্খ মুখি বেলাভূমি সূর্যাস্ত দেখার এক মোক্ষম জায়গা)।  শহর থেকে ১৭ কিমি.  দূরে জগতবিখ্যাত কোভালম, (এর খ্যাতির কি কুখ্যাতির পিছনে হিপি দের অনুদান প্রচুর) এখানে মধ্যবিত্ত ভারতীয় সস্তায় ইউরোপীয় জীবনের স্বাদ পেতে আসে, আর সব শেষে ভারকালার পাপনাশম বীচ, (নাম শুনেই বুঝতে পারছেন, মা মাসি সঙ্গে থাকলে,  আপনি এখানে যেতে বাধ্য)।
পৃথিবীর সব বীচ যে আদতে একই, বালি আর লোনা জলের খেলা মাত্র, এই সোজা কথাটা যখন আমার মা কে বোঝাতে না পেরে পাপনাশম বীচের দিকে বাধ্য হয়ে যাচ্ছি, ঠিক  তখন টেম্পো ট্রাভেলর এ, আমার পিতৃদেব আর আমার, দুজনেরই একটা চরম সত্যের  উপলব্ধি ঘটল । আরও একবার বুঝলাম যে, যা হয় তা ভালর জন্যেই হয় । আমার বাবা, টেম্পো ট্রাভেলর এর চালক ভেনু র কাছে জানতে পারলেন যে তাঁকে অনেকটা রজনিকান্তের আদলে দেখতে (অবশ্য এর পর থেকে আমার পিতৃদেব কে ঘরের মধ্যেও সানগ্লাস খোলাতে বেগ পেতে হয়েছিল আমাদের) আর আমি জানলাম আপ্পাম সহযোগে মাটন স্ট্যূ এর স্বাদ । আপ্পাম অর্থাৎ চালের গুঁড়ো দিয়ে তৈরি রুটি, অনেকটা আমাদের সরু  চাকলির  মত। এখন ও খুঁজে বেড়াই সেই আপ্পাম এর স্বাদ, যেটা ভারকালা পাপনাশম বীচে যেতে রাস্তার ধারে একটা ছোট্ট খাবার দোকানে পেয়েছিলাম।  
প্রত্যেক শহর এর কিছু বৈশিষ্ট থাকে । তিরুবনন্তপুরম এর স্বকীয়তা বজাই রেখেছে সেই শহরের মানুষের মূল্যবোধ । এই বিশ্বায়ন এর যুগেও তাদের কৃষ্টি ধরে রাখার আন্তরিক ইচ্ছে তাদের শহর কে আলাদা করেছে ভারতের অন্য শহর গুলোর থেকে । বিশাল বিশাল হাল ফ্যাশনের সাদা বিদেশি গাড়ি থেকে নামতে দেখেছি মালায়ালি দের, পরনে সাদা ধপধপে পাটভাঙা ধুতি, ওই লুঙ্গির মত করে পরা, আর সাদা শার্ট । চেহারার আভিজাত্য কিন্তু জিন্‌স আর টি – শার্ট এর অভাব এ একটুও কম লাগেনি ।  তাদের আচরনে সংযম, মুখে হাসি । ঔদ্ধত্য চোখে পড়েনি কোথাও । অথচ দেশের এই রাজ্যটাই সব চেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ কে দেশের বাইরে পাঠায় । খাঁড়ির দেশ গুলো তে ভারতীয় দক্ষ এবং অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে এরা বিশেষ ভাবে সমাদৃত । এই জায়গা টা তারা আদায় করেছে  কঠোর পরিশ্রম করে । এদের শিক্ষা আছে, খোলা মনে নতুন কিছু কে পরখ করার মানসিকতা আছে, অথচ কই, তার জন্যে তো নিজস্বতা কে বিসর্জন দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি এদের । বড় ভাল লাগলো । মালয়ালিদের কাছে বোধহয় অনেক কিছু শেখার আছে আমাদের ।

এর পর আরো দক্ষিনে পাড়ি দিয়েছি আমরা। আরো নতুন কিছু দেখা। তবে সে আর এক গল্প, আবার এক দিন হবেখন। আজ এই খানেই দাঁড়ি টানলাম।

কলমেঃ জয়ীতা সেন রায়

Wednesday, November 13, 2013

দক্ষিনাবর্ত – উটি পর্ব


স্মৃতি ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে এবং বিশ্বাসঘাতক। যখন যেটা মনে পড়ার কথা, সেইটা ছাড়া দুনিয়ার সমস্ত কিছু মনে পড়তে থাকে। এই যে লিখতে বসে প্রথমেই মনে করতে চেষ্টা করছি, ঠিক কোন বছরে আর কোন সময়টায় এই কলকাতা থেকে দক্ষিনমুখো সফরে বেরিয়েছিলাম, সেইটা কিছুতেই মনে পড়ছেনা। পরে, মনকে এই বলে প্রবোধ দিলাম, আমি যখনই যাইনা কেন, দক্ষিন তো দক্ষিনেই আছে। সেই যে তিনটে ঋতু, যাকে সায়েবরা বলতো – “হট”, “হ্টার” এবং “হটেস্ট”, তারও বদল হয়নি। হা-হতস্মী, সে সায়েবও গেছে, সে ইংরেজিও গেছে। এখন শুনি “হট” কথাটার মানে নাকি অন্য। কোন জায়গা সম্পর্কে “ইটস্‌ হট” বলার মানে... যাকগে, সে তো আপনি জানেনই। তার চেয়ে বরং আমার বেড়ানোর কথা কই। সময়টা কলকাতা আর ক্যালেন্ডারের হিসেবে শীতকালই ছিল বটে, সালটা বোধহয় ২০০৫ ই হবে। আমরা, মানে পরিবারের লোক জন আর বন্ধুস্থানীয় কয়েকজন মিলে যথা সময়ে হাওড়া স্টেশনে করমন্ডল এক্সপ্রেসে উঠে বসলাম বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে। আমাদের দলের সর্বকনিষ্ঠা আমার কন্যা, সবে দু বছর বয়স, আর সর্বজ্যেষ্ঠ আমার পিতৃদেব, ৬৫। যথা সময়ে চেন্নাই পৌঁছেও গেলাম । নেমে দেখি, বেশ ফুরফুরে আবহাওয়া, যেমনটা আশা করে এসেছি, একেবারেই তেমনটা নয়। বরং মেজাজ গুমোট হলো তামিলনাড়ু ট্যুরিজমের হোটেলে ঢুকে। কেমন যেন মৃয়মান সবকিছু। প্লাস্টার খুলে আসছে। সর্বত্র একটা অজত্নের ছাপ। কিন্তু সে গুমোট কাটিয়ে দিলো রিসেপশানের সদাহাস্যময়ী কৃষ্ণকলি। তার চুলে লাগানো যুঁই ফুলের আর মাথার তেলের ভুরভুরে সুবাসে আর “হট কাপি” র প্রতিশ্রূতিতে।
চেন্নাইতে গিয়ে আর পাঁচজন যা করে, মানে সেই মারিনা বিচে ঢূঁ মারা, সেখানে ইডলি - ধোসার দোকান, বেলুনওয়ালা, ভেঁপুওয়ালা সমেত সবই দেখা হলো আমাদের। আমার পুত্র তখন দশ বছরের। তাকে নিয়ে গেলাম ফোর্ট সেন্ট জর্জ। সেখানে বিশালাকৃতির কামানের পাশে আমার ছোট্ট শ্রীমানের ছবি আজও রয়েছে। তবে কিনা, বাকি সব দেখার পর দলের মেয়েরা, পুরুষ আর বাচ্ছাদের হোটেলে মালপত্রের সঙ্গে নামিয়ে রেখে মোক্ষ দর্শনে বেরোলাম। নাল্লি, কুমারন, পোতিস, বিখ্যাত সব শাড়ির দোকা্‌ শিহরন জাগানো সব নাম। মালপত্রের কলেবর স্বাভাবিক ভাবেই বেশ কিছুটা বৃদ্ধি পেলো।
পরের দিন সন্ধ্যেবেলা আমরা চড়ে বসলাম নীলগিরি এক্সপ্রেসে। আমরা চলেছি মেত্তুপালায়ম। এ জায়গাটার নাম হয়তো একটু অচেনা। আসলে মেত্তুপালয়ম হলো উটকামন্ডের প্রবেশদ্বার। উটকামন্ড? আরে বাবা উটি। এবারে নিশ্চিত বুঝেছেন। ভোরবেলার মেত্তুপালায়ম রেল স্টেশন অনেক দিন মনে থাকবে। হালকা কুয়াসা, গা শিরশিরে ঠান্ডা, নীলচে পাহাড়, জীবনযাত্রার অলস গতি, স্টীম ইঞ্জিন এর ধোঁওয়া ওড়ানো রোমম্যানটিসিসম আর কফির গন্ধে সে যেন আমাদের এই চেনা দুনিয়ার অনেকটা বাইরের কিছু।
প্রথম দর্শনেই উটির প্রেমে পড়লাম। ব্রিটিশদের হাতে তৈরি আর পাঁচটা শৈল শহরের মতই, কিন্তু ভারি ভালো লাগলো, এ শহর তার নিজস্বতা বজায় রাখতে পেরেছে। শুধুই ব্রিটিশের হাতে গড়া সাজানো খেলনা হয়ে থাকেনি। মনে আছে উটির বোটানিকাল গার্ডেন, উটি লেক আর দোদ্দাবেতা পর্বতের চুড়া। এই চুড়া নীলগিরির চূড়া গুলির মধ্যে অন্যতম। এখান থেকে দূরবিন দিয়ে চার     পাশের ১৮০ ডিগ্রি নীলগিরি পাহাড়ের শ্রেনীগুলো দেখা যায়। আর একটু নীচে তাকালেই যত দূর চোখ যায় মন ভালো করা সবুজের ঢেউ। নানান শেড এর সবুজ – কচি কলাপাতা সবুজ, বোতলের সবুজ রঙের সবুজ আবার কোথাও শ্যাওলা সবুজ। স্বাভাবিক ভাবেই জানতে ইচ্ছে করে, যে এই সবুজে সবুজ পাহাড় কে নীলগিরি বলে ডাকা হয় কেন? তামিলনাড়ু ট্যুরিজ্‌ম এর হোটেল তামিলনাড়ু-১ এর ম্যানেজার বাবু আমার খটকার উত্তর দিলেন। জানলাম, প্রতি ১২ বছরে এই নীলগিরি পাহাড়ে নিলাকুরুঞ্জি ফুল ফোটে। তখন, সেই নীল এর ঢেউ কে সামলাতে পারেনা এই সবুজ পাহাড়। সেই নীল পাহাড়ের আকর্ষণে দূর দুরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসে। এই খটকা টা তো গেল, তবে আর একটা এসে তার জায়গা নিল... অপরূপ সুন্দর একটা জায়গা...ততটাই সুন্দর এই পাহাড়-চূড়ার হোটেল, নামকরনের সময়, তামিলনাড়ু ছাড়া আর কোন নাম কারো মনে এল না কেন? এর সদুত্তর অবশ্য ম্যানেজার সাহেব দিতে পারেননি...তার বদলে দক্ষিনি কায়দায় মাথা দুলিয়ে আমায় একটা আকর্ণ বিস্তৃত ঝকঝকে সাদা দাঁতের হাসি উপহার দিলেন।
তবে কিনা, এসব ছাড়াও আমার আকর্ষন ছিল আরো এক জায়গায়। সেই ব্রিটিশ জমানার চেল্লারামের দোকান। এখানে জুতোসেলাই থেকে চণ্ডিপাঠের যাবতীয় বস্তু পাওয়া যায়। কিন্তু তা ছাড়াও উটিতে আরো যা যা পাওয়া যায়, তা একসঙ্গে বোধহয় অন্য কোথাও পাওয়া মুশকিল। যেমন ধরুন ইউক্যালিপ্টাস, লবঙ্গ বা এলাচের তেল, ঘরে তৈরি স্থানীয় চকোলেট, গোলমরিচ, আরো নানান ধরনের মশলা, যা এই নীলগিরির আনাচে কানাচে প্রচুর পরিমানে পাওয়া যায়। যে কোনও বাঙালি মেয়ের, না না...ভুল বলা হল, পৃথিবীর যে কোনও কোনের যে কোন মেয়ের প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে লালিত প্রতিভা, ঠিক মুল্যে, ঠিক জিনিসটা কেনাকাটা করার অসীম ক্ষমতা তাদের, এটা করতে পারার যে স্বর্গীয় সুখ, তার থেকে নিজেকে বঞ্চিত করতে পারলাম না এই দোকানে এসে..ব্যাগ এর চেন এর ওপর চাপ বাড়ল আর একটু।
উটি যদি তার ব্রিটিশ শৌখিনতার ধারা বহন করে থাকে, তাহলে তার সবচেয়ে বেশি প্রকাশ তার জিভে জল আনা কনফেকশনারি আর  বেকারির রকমারি তে,  আর  কেউ যদি ব্রিটিশ উন্নাসিকতার আভাস পেতে চান তাহলে উটি লেক এর আশেপাশে আগের প্রজন্মের দাদু দিদা দের পাক্কা ব্রিটিশ সাজপোশাকে সান্ধ্যভ্রমনে, অথবা উটির ক্লাব কালচারে টী-কোসি তে ঢাকা টী-পটরে, সান্ধ্যকালিন হাই –টী তে পরসেলেনের কাপ এ রূপোর চামচের টুং টাং এ  অথবা বহু–হোলড গলফ–কোরস এ ছুটির দিনের ভিড়ে সেটা প্রকট।
কুন্নুরের রাস্তায় দুদিকে ঢেউ খেলানো চা বাগান, আর মনে আছে এই কুন্নুরের রাস্তাতেই আমি জীবনের সবচেয়ে সুস্বাদু আনারস খেয়েছিলাম। সেই আনারসের চাকতি তে দক্ষিনি শুকনো লঙ্কার গুঁড়ো মাখানো...চূড়ান্তও ঝাল আর তুমুল মিষ্টির সেই কম্বিনেশান আমার রসনার স্মৃতি তে আজও অমলিন। এখানেই সিম পার্কে দেখেছিলাম প্রচুর রুদ্রাক্ষের গাছ। সেই  দেখে আমার মা আর পিসীর উল্লাস ফ্রেম বদ্ধ করার মত। আমার দুই বছরের কন্যার মত ছুটোছুটি করে তারা রুদ্রাক্ষ ফল কুড়িয়ে কুড়িয়ে কোঁচড় ভরতি করল। ঘরের বেষ্টনীর বাইরে বেরোতেই কত ছোট খুশি যে আমাদের মন ছুঁয়ে যায়...
উটি থেকে ১৯ কিমি. দূরে, পাইকারা নদী কে বেঁধে ফেলার একটা চেষ্টা হয়েছে। সাথে একটি জল-বিদ্যুত প্রকল্প, মানব সভ্যতার উন্নতির পথে আর একটা ধাপ। আশেপাশের সবুজ বন, ধাপে ধাপে নেমে আসা নদীর সফেন জল, জলের নিচে চিক চিক করা মাছের আনাগোনা, দূরে সবুজ পাহাড়ের পিছনে কালো আকাশের ব্যাকগ্রাউন্ড, সব যেন ঠোঁট ফুলিয়ে নালিশ জানাচ্ছিল আমাকে।
উটি মুগ্ধ করেছে আমায়। সত্যি বলতে কি, নেহা্ত বেরসিক না হলে, কারোর পক্ষে উটির অমোঘ মায়াবী আকর্ষন কাটানো কোন মতেই সম্ভব নয়।

ডেস্টিনেশন কথাটার বাংলা প্রতিশব্দ তেমন নেই। গন্তব্য শব্দটা তেমন চলে না। কিন্তু উর্দুতে ভারি সুন্দর একটা কথা আছে।আমাদের পরের “মন্‌জিল্‌” (মঞ্জিল নয়, বাংলায় ওটার মানে অট্টালিকা) পালঘাট, কেরলের একটা ঘুম-জড়ানো মফস্বল শহর। তবে সে আর এক গল্প, অন্য এক বৃত্তান্ত।

কলমে ঃ জয়ীতা সেন রায়

Tuesday, November 12, 2013

Ruminations 3

Life is glitz, want, expectations, ambition, stress, fear, insecurities, living up to image, tooth and claw, possessiveness, jealousy, gluttony, ...
Death is unceremonious...death is abrupt...death is peace...
we all live to an average of 70-80 years, the world as we know it, is perhaps here for another couple of million...
we prefer to close our eyes, avoid the inevitable, live and act only for now and stay happy in the belief...that..nothings gonna change
delusional...aren't we?

Monday, November 11, 2013

Ruminations 2

What would it feel like to share one's successes and happiness along with  his frustrations and anguish, his misery, dejection and distress....I wonder! How fulfilling can be the feeling of being a part of his achievements, his ecstasy, his bliss? This feeling of pride and honour of being a part of both the ups as well as the downs of someone's life....something worth waiting for, till my last days...I believe

Friday, November 1, 2013

Ruminations 1

Does it cross my mind, while taking leave of someone, that this might be the very last time that I will see that particular toothy smile, that tilt of head while waving, and that blurred image as the image faded beyond my vision?
I admit...it rarely does....If it did, more frequently, wouldn't I take more care in trying to give a little bit more of the rain-drenched me? woudn't I remember the arches of the brow, the feel of the wet palm...the smell... the aura...the moment...more carefully ?


Loneliness Celebrated

The lonely day is now my friend a lonely sigh, gasping for sound a lonely tear to cool my face as the wheels of time, come a round. ...